রাজনৈতিক ছত্রছায়ার সম্পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার সম্পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ, নামে-বেনামে সম্পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদন : তুহিন
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী ও সদস্য (প্রকৌশল)-এর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা রকিবুল ইসলাম তালুকদারকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। ড্রেজিং প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি তার মোবাইল সিম ব্যবহার, পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ড্রেজিং বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগে রকিবুল ইসলাম তালুকদার একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে প্রকল্প, টেন্ডার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
নিজের নামে নয়, অন্যের নামে সিম ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, রকিবুল ইসলাম তালুকদারের ব্যবহৃত একটি মোবাইল সিম তার নিজের নামে নিবন্ধিত নয়। সিমটি অন্য একজনের নামে নিবন্ধিত বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করাই কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। সিমটি কে ব্যবহার করেছেন, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেটি দাপ্তরিক বা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সিমের নিবন্ধন, ব্যবহার ও যোগাযোগের তথ্য আইনানুগভাবে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
স্ত্রী-মেয়ের নামে সম্পদের অভিযোগ
রকিবুল ইসলাম তালুকদারের বিরুদ্ধে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্ত্রী ও মেয়েদের নামে ঢাকার শান্তিনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, জমি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানেও সম্পদ থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সম্পত্তির দলিল, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যাচাই ছাড়া কোনো সম্পদকে অবৈধ বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বলা যায় না।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ
রকিবুল ইসলাম তালুকদারের বিরুদ্ধে সাবেক সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে ড্রেজিং প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) সোহায়েল আহমেদ তার আত্মীয়—এমন সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে কারও সঙ্গে পরিচয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকলেই দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, টেন্ডার, কার্যাদেশ ও আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রকিবুল ইসলাম তালুকদার নিজের অতীতের প্রভাব আড়াল করতে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাকে ‘ছাত্রদলের সাবেক নেতাকর্মী’ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় বা পরিচিতির কোনো পরিবর্তন নিজে দুর্নীতির প্রমাণ নয়।
এত অভিযোগের পরও কেন ব্যবস্থা নেই?
রকিবুল ইসলাম তালুকদারকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগগুলো কতটা সত্য, তা যাচাইয়ে কার্যকর কোনো তদন্ত হয়েছে কি না।
অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে তিনি যেসব প্রকল্প, টেন্ডার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেসব ক্ষেত্রে অভিযোগের নিরপেক্ষতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে মিলতে পারে প্রকৃত চিত্র
রকিবুল ইসলাম তালুকদারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তার আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদ বিবরণী, স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা সম্পত্তি, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের অর্থের উৎস যাচাইয়ের পাশাপাশি ড্রেজিং প্রকল্পের টেন্ডার, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার ও আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে বড় ড্রেজিং প্রকল্পগুলোর কারিগরি ও আর্থিক অডিট হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম বা অতিরিক্ত ব্যয়ের কোনো প্রমাণ আছে কি না, সেটিও স্পষ্ট হতে পারে।
রকিবুলের বক্তব্য
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রকিবুল ইসলাম তালুকদার। তার দাবি, অভিযোগগুলো মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অভিযোগের সত্যতা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও তার আপত্তি নেই বলে তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলার কথা জানা গেছে। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন ও কমিশনের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত
বিআইডব্লিউটিএ দেশের নৌপথ উন্নয়ন, নদী খনন ও নৌপরিবহন অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটির বড় প্রকল্পে সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
রকিবুল ইসলাম তালুকদারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্কের পরিবর্তে নথি, আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে
প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা এক্সে দ্রুত শেয়ার করতে ক্লিক করুন

